হারুন স্যার
আমি বরাবরই ইংরেজিতে বিশেষ দক্ষ ছিলাম। এমন দক্ষ ছিলাম যে পরীক্ষায় ৩৩ এর চেয়ে বেশি নম্বর উঠাতে পারতাম না! হয়তো ইংরেজরা আমাদের যে দুইশত বছর শাসন করেছে,শোষণ করেছে, সেই ঘৃণায় মনে ইংরেজির স্থান পেত না। এটা অবচেতন মনের কাজ হলেও হতে পারে।
.
ইংরেজিতে কোনভাবে টেনেটুনে এসএসসি পাস করে কলেজে এসে দেখি আবারও ইংরেজি। নতুন পরিচয়ে, নতুন কলেবরে, নতুন ভীতি নিয়ে হাজির। ভয় দেখানোর মাঝেই মনে হয় তার সার্থকতা।
.
আমাদের কলেজের ইংরেজি স্যার ছিলেন, হারুন স্যার।যার বিশেষন, দুনিয়ায় আবিস্কার হয়নি এখনো। "ইম্পর্টেন্স অফ লার্নিং ইংলিশ" স্যার এর চেয়ে বেশি আর কেউ মনে হয় জানতো না।
.
স্যার ক্লাসে একটি কথা বলেছিলেন, যা আমার মনে আজও চিরসবুজ। স্যার বলেছিলেন, "নিজেকে শিক্ষিত প্রমাণ করার জন্য হলেও ইংরেজি শিখতে হবে। বাংলা তো সবাই বলতে পারে। শিক্ষিত-অশিক্ষিত সবাই। কিন্তু ইংরেজিটা শুধুমাত্র এদেশের শিক্ষিতদের জন্য বরাদ্দ। "
.
স্যারের পড়ানোর ধরন ছিল একেবারে ভিন্ন। স্যারের কথা হলো, আগে আমাদের শিখতে হবে, জানতে হবে। তারপর প্রয়োগের কথা ভাবতে হবে। কিন্তু জানার আগে, শেখার আগেই যদি প্রয়োগের কথা চিন্তা করি বা প্রয়োগের চেষ্টা করি তাহলে তা প্রতারণা বৈ কিছুই না।
.
আমাদের সময় এসএসসি এবং এইচএসসি তে ইংরেজি প্রথম পত্রে ৯নং ও ১০ নং শূন্যস্থান আসতো। একটাতে ক্লু দেওয়া থাকতো। অন্যটাতে দেওয়া থাকতো না। বিশ্বাস করেন রাসেল ভাই, হারুন স্যারের ক্লাস করার আগ পর্যন্ত জানতাম এগুলো মুখস্ত করতে হয়। কমন পড়লে দেওয়া যাবে নয়তো আন্দাজে দিতে হবে।
.
কিন্তু স্যার বুঝালেন এগুলো মুখস্ত করা মানে নিজের সাথেই প্রতারণা করা। সাবজেক্ট-ভার্ব-এগ্রিমেন্ট অনুসারে কোথায় নাউন হবে, কোথায় এডজেকটিভ হবে, কোথায় ভার্ব হবে বুঝিয়ে দিতেন। কিভাবে চেনা যায় তার তাও শিখেছিলেন।
.
হারুন স্যারের খুব ভালো একটা বৈশিষ্ট্য ছিলো। তা হলো তিনি আমাদের কথাগুলো খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। পড়াশোনার ব্যাপার ছাড়াও অন্য সকল কথা স্যার কে বলতে পারতাম।
.
সত্যি কথা বলতে কি, ইন্টারে পড়ার সময় স্যারের পড়া কে তেমন গুরুত্ব দিতাম না। কারন চাকচিক্যের প্রতি মানুষের আকর্ষণ সহজাত। ক্ষতি জেনেও রুচিকর খাদ্য গ্রহণ করতে মানুষের মনে বাধে না। এখনতো প্রদর্শনীর যুগ। প্রদর্শনই মূল বিষয়। ভিতরে কিছু থাকুক বা নাই থাকুক। কিন্তু হারুন স্যার ছিলেন গানের পাখির মতন। কেউ তার গান শুনুক বা না শুনুক তিনি আপন গতিতেই তার গান গেয়ে যাবেন।
.
পড়াশোনা শেষ করে যখন বিসিএস এর কোচিং করি। তখন প্রতিটি ইংরেজি ক্লাসে হারুন স্যারকে মনে হয়। হায়! কোচিংয়ের স্যার এখন যা পড়াচ্ছে তা 7-8 বছর আগেই হারুন স্যার আমাদের পড়িয়েছিলেন। তখন এত গুরুত্ব দেয়নি কেন?
কথায় বলে মানুষ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বুঝে না
.
এত বছর পরও নরসিংদীর কোন রাস্তায় স্যারের সাথে দেখা হলে খুব মিষ্টি করে ডাক দিয়ে বলেন, "রিপন, কোথায় যাচ্ছ?" মনে তখন খুব অন্যরকম অনুভূতি কাজ করে, খুব ভালো লাগে। এতদিন পরেও স্যার আমার নাম মনে রেখেছে। ছাত্র হিসেবে এটা চরম পাওয়া।
.
স্যার কে আমি একদিন আদাব জানালে তিনি চুপ করে মাথা নাড়েন। কারণ জিজ্ঞেস করলে স্যার বলেন, "যেদিন ইংরেজিতে ভালো নাম্বার পেয়ে পাশ করে আসবে, সেদিন আদাব এর উত্তর দেবো।" আমার মনে জেদ চেপে গিয়েছিলো যেখানে এসএসসিতে ইংরেজিতে সি গ্রেড পেয়েছিলাম, সেখানে এইচএসসিতে এ গ্রেড পেয়েছি। যার কৃতিত্ব আংশিক নয় পুরোটাই স্যারের।
.
শত সহস্র বছর বেঁচে থাকুক স্যার। সমাজকে আলোতে নিয়ে আসতে আপনার প্রয়োজন কখনো ফুরাবে না। আর আপনি আজীবন ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে প্রিয় শিক্ষক হয়েই বাঁচুন।

কোন মন্তব্য নেই