স্মৃতিকথা
নৌকা করে অনেক মানুষ নদী পার হচ্ছে। নৌকা যখন মাঝ নদীতে, তখন এক যাত্রী বলে ওঠে, "এ মাঝি, কি করলি? পাগলকে যে নৌকায় তুললি, এখন যদি নৌকা ডুবায় দেয়? তখন কি করবি?" এতক্ষণ নৌকায় বসা পাগলকে কেউ লক্ষ্যই করেনি। পাগলও তারমতোই বসে ছিলো। কোন উৎপাত করে নি। যেই পাগলটি ঐ যাত্রীর কথা শুনলো, তখনই নৌকায় একটা বড়সড় দোলনি দিয়ে বলে, "এইতো দিলি মনে করায়ে।"
ফেসবুকের নিউজ ফিডে যখন 'স্মৃতিতে আমাদের আব্দুল মান্নান ভূইয়া কলেজ' নামের গ্রুপটি চোখে পড়ে, তখন আমিও চেঁচিয়ে বলি "এইতো দিলি মনে করায়ে।"
যখন বাতাস থাকে না তখন পুকুরের পানিতে ঢেউ থাকে না। তাই বলে আমি বলতে পারিনা যে পুকুরে কখনও ঢেউ হবে না? অনুকূল পরিবেশ বা বাতাস আসলেই পুনরায় ঢেউ আসবে। তেমনি আমাদের মস্তিষ্ক সকল তথ্যই স্তরে স্তরে জমিয়ে রাখে। অনুকূল পরিবেশ পেলেই সে স্মৃতির ডালা খুলে বসে। অজস্র কথা, অজস্র স্মৃতি, হাসি-কান্না-গান-সুখ-ব্যথা মনে করিয়ে দেয়। তেমনি কলেজ কেন্দ্রিক স্মৃতিগুলো অনুকূল পরিবেশ পেয়ে তরতর করে আঙ্গুলের ডগা হতে শুভ্র রোলটানা খাতায় নেমে আসে।
কলেজের ভর্তির দিনটি আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। আমাদের এলাকার শাহিন ডাক্তার (কলেজ মোড়ে ফার্মেসি) আমাকে একটা কাগজে কিছু লিখে দিয়ে বলে এটা নিয়ে সুমন স্যারকে দিবি। তোর ভর্তি ফি অর্ধেক করে দেবে।
সুমন স্যার ও অপূর্ব স্যার তখন বদরপুর থাকা সত্বেও আমি তাদের চিনতাম না। সত্য কথা বলতে কি আমি আমাদের গ্রামের অনেক লোককেই তখন চিনতাম না। সারাদিন বই নিয়ে পড়ে থাকতাম। খেলাধুলা করতাম না। তাই তেমন করে কারও সাথেই পরিচয় হত না।
কলেজে ঢুকে প্রিন্সিপাল স্যারের রুমের পরের রুমে দেখি কিছু স্যার বসা আছে। আমি গিয়ে সোজা প্রশ্ন করি, "সুমন স্যার আছে।" একজন স্যার বলল, "হ্যাঁ, আমি সুমন স্যার। আমি বলি, "শাহীন মামা এটা আপনাকে দিতে বলেছে।"
সেই থেকে শুরু,
তারপর একদিন একদিন করে কলেজ কে আপন করে নেওয়া, কলেজকে ভালোবাসা, সবার সাথে পরিচিত হওয়া এক অন্যরকম অনুভূতি, অন্যরকম ভালোলাগা। সেই ভালো লাগা মনে এখনও স্পষ্টই আছে। আমার প্রিয় স্যারের আন্তরিক স্নেহ-ভালোবাসা পেয়ে আমার কাছে মনে হল, আমি যেন ছোট্ট দিঘী থেকে মহাসমুদ্রে পতিত হয়েছি। অন্তর্মুখী স্বভাব একেবারেই কর্পূরের মত উবে গেল।
স্কুলে পড়ার সময় আমি কখনোই কোন অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করিনি। এমনকি উপস্থিত ও হতাম না। আমার কাছ থেকে কবিতা লিখিয়ে নিয়ে স্বরচিত কবিতা আবৃত্তিতে অনেক বান্ধুবি পুরস্কার বাগিয়ে নিতো। সেই আমি কিনা কলেজে পড়ার সময় দুটি বছর এমন কোন অনুষ্ঠান নেই যেটাতে অংশগ্রহণ করি নি। গান, কবিতা আবৃত্তি, বক্তিতা সবকিছুতে অংশগ্রহণ করতাম। কলেজে পড়ার সময় আমার ম্যাজিকে খুব আগ্রহ ছিল এবং প্রায় প্রতিটি অনুষ্ঠানেই ম্যাজিক দেখাতাম।
কলেজে কিছু বন্ধু পেয়েছিলাম যাদের নাম সারা জীবন অন্তরে থিতু হয়ে থাকবে। মনের ছোট্ট নীড়ে তাদের আমি তোয়া করে রেখে দিয়েছি। সেই বন্ধুদের নিয়ে কথা বলার কোন ক্ষমতায় ঈশ্বর আমাকে দেন নি। আর দিলেও বলতে পারতাম না। এত আপন ছিল সেই বন্ধু গুলি। কলেজ কোন দিন কামাই দিতাম না শুধুমাত্র বন্ধুদের সঙ্গে পাওয়ার লোভে।

কোন মন্তব্য নেই