অপূর্ব স্যার
কানা ছেলের নাম নাকি পদ্মলোচন। অনেক কালো লোককে দেখেছি যার নাম ধলা মিয়া। হতদরিদ্র লোকের নাম হয় আমির হোসেন। রাস্তায় ভিক্ষা করে একজনকে চিনি, যার নাম বাদশা মিয়া। শান্ত নামের ছেলেরা বেশি দুষ্টু হয়। তাইতো গুরুজনেরা বলেন নামে কি আসে যায়, কর্মই মুখ্য আর সব গৌণ।
কিন্তু আমি এমন একজন মহৎ মানুষকে চিনি, যিনি তার নামের মতোই উজ্জ্বল। একেবারে উপমান কর্মধারয় সমাস। তিনি হলেন আমাদের অপূর্ব স্যার। নামের মতোই অপূর্ব
আমার মধ্যে "জানার আগ্রহ" যিনি করে দিয়েছিলন, মনের ভিতর জিজ্ঞাসার বীজ যিনি বপন করে দিয়েছিলেন, তিনি সেই অপূর্ব স্যার। এখানে একটা মজার কারণ আছে। আমরা যেদিন পড়া না শিখে যেতাম, সেদিন চার পাঁচ জন বন্ধু মিলে উদ্ভট প্রশ্ন তৈরি করে রাখতাম। স্যার ক্লাসে আসতেই জিজ্ঞেস করতাম। 'বৃষ্টির সময় বিদ্যুৎ চমকায় কেন? শীতের দিন সকালে টিউবওয়েলের পানি গরম লাগে কেন?
পিপড়া কামর দিলে ব্যথা লাগে কেনো? বাতাস দেখি না কেনো?' এই জাতীয় প্রশ্ন করতাম। স্যারও যথাযথ উত্তর দিত আর ক্লাসের সময় শেষ হয়ে যেত।
স্যার অনেক কিছু জানেন। অনেক বিষয়ে পড়াশোনা আছে। এই ধারণাটি তখন যেমন ছিল এখনো স্বমহিমায় মনের ভেতর আছে। ইন্টারে পড়ার সময় মনের ভিতর কোন প্রশ্ন উদয় হলে স্যারকে জিজ্ঞেস করতাম। খুব সুন্দর যুক্তিযুক্ত উত্তর পেতাম।
এবার আসি পড়ার বিষয়ে। স্যার আমাদের সাচিবিক বিদ্যা ও অফিস ব্যবস্থাপনা পড়াতেন। আমার কাছে মনে হয়েছে এই বিষয়ে স্যারের চেয়ে আর কেউ, ভালোভাবে পড়াতে পারবে না। স্যারকে কখনোই বই হাতে নিয়ে পড়াতে দেখিনি। সুন্দর সাবলীল ভাবে পড়াতেন।
একটা বিষয় তখন আমরা প্রায় সবাই লক্ষ করতাম। ক্লাসে পড়ানোর সময় স্যারের ফোনে কল আসতো। অল্প সাউন্ডে টুন টুন করে বেজেই যেতো কল রিসিভ করতেন না। প্রতিদিন না হলেও প্রায়ই এমন হতো। মনে আজও অম্লান। এখনো স্যারের ক্লাস করার সময় সেই ফোন কল আসে?
এখনকার সময়ে শিক্ষার্থীদের কাছে স্যারের একটা গোপন পরিচয় দিচ্ছি। এটা আমাদের ২০১১ সালের ব্যাচের সবাই জানে। স্যার একজন খুব ভালো নাট্যকার। অপূর্ব স্যারের পরিচালনায় কলেজের নাটক করেছিলাম। নাম ছিল "ভাষায় ফিরে যাওয়া।" সৌভাগ্যবশত সেই নাটকের নায়ক আমিই ছিলাম।
স্যারের ক্লাসে মজা ছিল স্যার মারতেন না। স্যার প্রায় সময়ই পড়া জিজ্ঞেস করতেন না। নিবিষ্ট মনে পড়িয়ে যেতেন। পড়া মনের ভিতরে গেঁথে দিতেন।
স্যার আমাদের যে 'সাচিবিক বিদ্যা ও অফিস ব্যবস্থাপনা' বিষয়ের উপর ক্লাস নিতেন। কি জানি ছাতার মাথা শর্টহ্যান্ড লিখা মাথায় ঢুকতো না। শুধু আকিঁবুকিঁ ছাড়া আর কিছুই না।
আমি শর্টহ্যান্ড শিখতাম না। স্যার কে বলেছিলাম, "স্যার দশ নাম্বার পাইলে পামু, না পাইলে নাই। তাও এই অশিক্ষিত লেখা শিখতাম না।" স্যার অবাক হয়ে বলেছিল, "অশিক্ষিতদের লেখা মানে?" আমি বলি, "স্যার এইসব আঁকিবুকি শিক্ষিতদের লেখা? কোন শ্রী নেই। একেবারে যাচ্ছেতাই। তেলাপোকা ছেড়ে দিলে ভালো লেখা হবে।"
অথচ দুনিয়াটা কি বুমেরাং! আশ্চর্য ভাবেই মানুষ যা না চায়, তাই সামনে আসে। পড়াশোনা শেষ করে আমার অনেক বন্ধুই পাঁচ ছয় হাজার টাকা খরচ করে শর্টহ্যান্ডের কোর্স করেছে। আমি মোটেও যায়নি। ঘৃণাভরে একবার যাকে ফেলে দিয়েছি, তা কোন সাহসে তুলে আনব?
কলেজে অপূর্ব স্যার ছিলেন আমার অভিভাবকের মতো। বেতনের টাকা কমাতে হবে? স্যারকে ধরতাম। ফরম ফিলাপের টাকা কমাতে হবে? তাও স্যারকে ধরতাম। আমাকেও স্যার খালি হাতে ফেরাতো না। নিরাশ করত না ।
স্যারকে আজও ভালবাসি, শ্রদ্ধা করি অবনত মস্তকে। যতদিন যাবে স্মৃতির পাতায় স্যারের নাম স্বর্ণাক্ষরে খোদাই করা থাকবে। স্যার আমার মনে কালোত্তীর্ণ অমর। প্রতিটি শিক্ষার্থীর নিকটই স্যার ছিলেন, ছিলেন অপূর্ব!

কোন মন্তব্য নেই