স্মৃতিতে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ ফেসবুক গ্রুপের নির্বাচিত লেখাগুলো নিয়েই আমাদের এই আয়োজন

কেয়া ম্যাম

প্রচন্ড ঝড়ের আগে যেমন প্রকৃতির সব কিছু শান্ত হয়ে যায়। থেমে যায় পাখিদের কোলাহল। গর্তজিবি প্রাণীগুলো ডুকে পরে গর্তে। তেমনি কেয়া ম্যাম; মানে আমাদের বাংলা ম্যাম ক্লাশে ঢুকার সাথে সাথেই থেমে যেত সবকিছু। তখন একমাত্র শোনা যেত হৃদপিন্ডের আহত ভাষা। ইলেকট্রিক ফ্যানের শব্দ আমার কাছে মনে হতো, অদৃষ্ট কোন কারনে তাও থেমে যায়।

আমরা ছিলাম গোবেচারা ফাঁকিবাজ কিছু ছাত্র। মনে মনে এক হাঁড়ি কু-আর্শিবাদ দিতাম। মাথা নিচু করে রাখতাম ভয়ে। এই বুঝি, আমাকে পড়া জিজ্ঞেস করল। এই বুঝি, কিছু কড়া কথা শুনতে হবে, অথবা পিঠে বা হাতে দুই-চারি বেতও পড়তে পারে। মোটামুটি গোবেচারা হলেও ঘাটে একটু-আধটু বুদ্ধিও ছিল। পূর্ণ আত্মবিশ্বাস রাখতাম চোখে। যেন ম্যাম কখন পড়া জিজ্ঞেস করবে, আর কখন বলব সেই আশাই আছি।

আজ পড়াশোনা শেষ করে স্পষ্ট বুঝতে পারছি, ম্যাডামের সেই দিনের সেই কড়া শাসন না হৃদয়ে ধারণ না করলে আজ হারিয়ে যেতাম। খসে পড়া কোন তারার মতো নিঃশেষ হতো আমার সামনে চলার পথ। সেইদিন যদি ম্যামকে ভয় না পেতাম, তার কথা যদি কর্ণকুহরে রেখে দিতাম, যদি হৃদয়ঙ্গম করতে না পারতাম, তাহলে কামিয়াব তো দূরের কথা ; বন্ধুর পথের বাকেই হারাতাম পথের দিশা।

পারতপক্ষে প্রথম প্রথম যে কোন শিক্ষার্থীই ম্যামের শাসনে অতিষ্ঠ হয়ে কু-আশির্বাদ দিতে পিছপা হবেনা। কিন্তু কয়লার খনিতে যে শ্রমিক হীরার সন্ধান পায়, একমাত্র সেই জানে পৃথিবী কত আনন্দময়। তেমনি কেয়া ম্যামের মমতাময়ী রূপটি যে শিক্ষার্থী আবিষ্কার করতে পারবে, আমি হলফ করে বলতে পারি তার স্মৃতিতে ম্যাডাম থেকে যাবে আজীবন। মস্তিষ্কের সেরেব্রামের যে অংশ স্মৃতি স্থায়ীভাবে জমা করে রাখে, সেই স্থানেই থিতু হবেন জন্ম-জন্মান্তর।

একটা ঘটনা না বলেই পারছিনা। আমি দ্বাদশ শ্রেণীতে পড়ার সময় বাংলা দ্বিতীয় পত্র পড়ার জন্য ম্যাডামের বাসায় যেতাম। সাইকেলে যেতাম। আমি আর শাহ আলম পড়তাম একসাথে। এক মাস পর যখন ম্যাডামকে পড়ানোর টাকা দিতে গিয়েছি, তখন স্পষ্ট ভাষায় বলল, "টাকা দিতে চাইলে কাল থেকে আমার কাছে পড়তে এসো না।

কি বলবো বুঝতে পারছি না। এখনকার মতো গুছিয়ে কথা বলা সেদিন শিখতে পারেনি। তাই কিছু না বলেই এক বুক আনন্দ, শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও প্রেরণা নিয়ে বাসায় চলে আসলাম। মনে মনে ভাবছি, আমি পেয়েছি ম্যামের মমতাময়ী হৃদয়ের সন্ধান। আর তার কিছু ছাত্রের মত আমিও স্থান পেয়েছি তার পদকমলে।

আমাদের ধর্মে পাঁচ প্রকার গুরু রয়েছেন। যাদের কথা অবশ্য পালনীয়। পাঁচ প্রকার গুরুর মধ্যে হচ্ছেন, পিতা, মাতা, জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা, দীক্ষাগুরু এবং শিক্ষাগুরু। তাই আমি যাদের কাছ থেকে কিছু শিখেছি তারাই আমার কাছে শিক্ষাগুরুর ন্যায় পূজ্য।

আমাদের এমনভাবে পড়াতেন যেন সত্যিই গুরুগৃহে একজন গুরু তার শিক্ষার্থীদের কঠোর শিক্ষা দিচ্ছেন জীবন সম্পর্কে, বাস্তবতা সম্পর্কে। যিনি জানেন তার গৃহে একলব্য, অর্জুন বা কর্ণের মতন শিক্ষার্থী যেমন আছে, তেমনি আছে দূর্যোধনের মতো শিক্ষার্থীও। তাই কঠোর হওয়া এখানে অবশ্য। একটু কঠোর না হতে পারলে আঁধার ভেঙ্গে যে সূর্যকে আনা যায় না, ম্যাম তা জানতেন।

পরিশেষে, আর বিশেষ কিছু বলতে চাই না। ম্যাম আপনি আজীবন আমার শিরস্ত্রাণ হয়ে শিরেই থাকবেন। আপনাকে নামানোর ক্ষমতা ঈশ্বর ভিন্ন আর কারোই নেই। কোন ভুল যদি করে থাকি তাহলে, ছাত্র হিসেবে, সন্তান হিসেবে ক্ষমা করে দেবেন।



কোন মন্তব্য নেই

Blogger দ্বারা পরিচালিত.