খাদেম স্যার
বাংলা একাডেমির অভিধান বইতে খাদেম অর্থ হলো যে খেদমত করে এমন। খাদেম স্যার প্রকৃত অর্থেই খেদমত করতেন। শিক্ষার খেদমত। যে দায়িত্ব নিয়ে কলেজে আছেন তার প্রকৃত খেদমতকারী তিনি। শিক্ষাদান করাটাকে তিনি সত্যিকার অর্থেই আত্মস্থ করে নিয়েছিলেন। নিয়েছিলেন নিজের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে বেঁধে নিরলসভাবে আমাদেরকে সেবা দিতে।
স্যার ছিলেন একজন মূর্তমান অভিনেতা। যিনি পূর্ব প্রস্তুতি, পূর্ব প্রস্তুত কোন স্ক্রিপ্ট ছাড়াই অভিনয়ে মন্ত্রমুগ্ধ করে রাখতেন গোটা ক্লাস। ক্লাসে ঢোকার পর স্যারকে বলতে হয় না, "চুপ করো, কিপ সাইলেন্ট।" স্যারের মোহনীয় হাসি আর সুশ্রী বাচনভঙ্গির জাদুতে ক্লাসরুম এমনিতেই চুপ হয়ে যায়।
হাস্যোচ্ছলে স্যারের বলা কথাগুলো এখনো অন্তরে বাজে।
স্যার ক্লাসে প্রায়ই বলতেন, "আমি আমার ছেলেকে রায়পুরা বিয়া করাবো। আর বিয়েতে আগের কালের মতন মাইক বাজাবো।" স্যার এত সুন্দর করে কথাগুলো বলতেন যে, মন্ত্রমুগ্ধের মত হয়ে শুনতাম আর ভাবতাম ভবিষ্যতে আমিও এত সুন্দর করে কথা বলব।
স্যার প্রায়ই ক্লাসেই আমাদের জীবন চলার পথের বাঁকগুলো গল্পাকারে বুঝিয়ে দিতেন। আচার-আচরণ সম্পর্কের শিক্ষা দিতেন। যে শিক্ষা নিয়ে আজ আমি মানুষ। একজন পূর্ণাঙ্গ মানুষ। ভবিষ্যতে মানুষই থাকবো। শুধু মাত্র স্যারের পাথেয়গুলো অন্তরে ধারণ করে।
আচরণের স্থায়ী পরিবর্তন কে এক কথায় শিক্ষা বলে। আর আমাদের সহপাঠী যারা আছেন সবার আচরণেই ইতিবাচক পরিবর্তনে খাদেম স্যারের খুব বড় একটা অবদান রয়েছে। স্যারের কথা বলা কিংবা চলার ধরন ছিল একেবারে মার্জিত এবং বন্ধুবৎসল।
আমি আমার কলেজ জীবনে কখনো স্যারকে রাগতে দেখিনি। কোন ছাত্রকেও তিনি কঠোরভাবে তিরস্কার করেন নি। কোন সহজ অঙ্ক না পারলেও স্যার বারবার বোঝাতেন কিন্তু কখনোই বিরক্ত হতেন না বরং মমতা নিয়ে step-by-step বুঝিয়েছেন। স্যারের জন্য অনার্সে হিসাব বিজ্ঞান সাবজেক্ট পেয়ে খুব খুশিই হয়েছিলাম।
এ পর্যন্ত আমি যাই লিখেছি, সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হয়েছে এই লেখাটায়। কারণ আমি শুধু একজন স্যারকে নিয়ে লিখছি না, লিখছি একজন কবিকে নিয়ে। যেদিন স্যারের কবিতার বই "যদি মনে পড়ে " বের হয়েছিল, তখন বন্ধুদের গর্ব করে বলেছিলাম, "দেখ, এটা আমাদের স্যারের বই।"
সুশ্রী, বাকপটু ও সদাহাস্যময় অধর সৃষ্টিকর্তা নিজ হাতে স্যারকে দান করেছেন। আর দিয়েছেন মানুষের মন জয় করার অযুত সহস্র গুণ। যা এক অনুচ্ছেদে লিখে শেষ করতে চাইলে হবে ঝিনুক দিয়ে সমুদ্র সেঁচার মতন।
বিন্দুর মাঝে সিন্ধুর গভীরতা আমি স্যারের মাঝে প্রত্যক্ষ করেছি। হ্যাঁ, বলতে দ্বিধা নেই এতদিন পরে কিভাবে এসব বলতে পারছি। শিক্ষকতা পেশায় যখন আসলাম, তখন আমার চর্মচক্ষু দ্বার উন্মীলিত হয়ে এক নতুন জ্ঞানের রাজ্যে পৌছালাম। আর এখন উপলব্ধি করতে পারছি আমার শিক্ষকরা কতটুকু জ্ঞানের আধার ছিলেন!
একটা কথা প্রথমেই বলেছিলাম, স্যার কে কখনোই রাগতে দেখে নি। স্যার ছিলেন সদাহাস্যময়। ঈশ্বরের কাছে কৃতাঞ্জলিপুটে বলি, হে ঈশ্বর, স্যার যেন শত বৎসর তার হাসিমুখ নিয়ে বেঁচে থাকে। আর তার বিমোহিত কথার জাদুতে আমাদের বেঁধে রাখেন আজীবন।
©Ripon Barman

কোন মন্তব্য নেই