ঈদ বোনাস
বিকেলে স্টুডেন্ট পড়াচ্ছি। ভাতিজা এসে বলে “কাকা বিশ টাকা দেও।" প্লে শ্রেনীতে পড়ে সে। এইতো ক’দিন হলো পুরো বাক্য বলতে শিখেছে আর সে কিনা এখন বিশ টাকা চাচ্ছে!
জিজ্ঞেস করলাম, “কি করবা বাবু টাকা দিয়া।”
ভাতিজা আমার সুন্দর করে বলে, “কাকা, ইপ্পিড খাবো।”
খুব কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করি, “বাবু, ইপ্পিড কি?”
যাই হোক অনেক কষ্টে পাঠোদ্ধার করলাম যে ‘ইপ্পিড’ হলো ‘স্পিড’। এতে নাকি হেব্বি এনার্জি থাকে।
এই এনার্জি নিয়া মহা প্যারায় আছি। আমাদের বাসা থেকে নরসিংদী সরকারি কলেজ মোটামুটি কাছেই। তারপরেও যেতে এনার্জি পাই না। বাদুয়ার চরের বড় ব্রিজের এখান থেকে অটুতে উঠো আর আরশি নগর এসে নামো। সরল অঙ্কের মতোই খুব সরল। এত সরল থাকা সত্ত্বেও এনার্জি পাই না। তাই ভাতিজার দেখাদেখি আমিও খেলাম একটা। খেয়ে ঔষধ ঔষধ মনে হইছে। বেশ মিষ্টি!!
ঝামেলার আরেক নাম এই ব্যাটারি চালিত অটু রিকশা। পিছনের সিট গুলো মনে হয় মহিলাদের জন্যই বরাদ্দ। ড্রাইভারদের ভাব ভঙ্গি দেখলে মনে হয় নিতান্ত দয়াপরবশ হয়ে তার অটু রিকশাতে আমাদের নিচ্ছে। তারপরেও দু’জনের জায়গায় তিনজন বসে চিড়েচ্যাপটা হতে হয়।
এই ড্রাইভাররা ঈদে বোনাস চায়। বেতনের অর্ধেক না; সমপরিমাণ। এর জন্য আমি ঈদের আগের দিন আর ঈদের দিন আর পরের দুই দিন কোথাও বেরই হই না। পকেট খালিই থাকে বেশিরভাগ সময়। মানিব্যাগ নাই। মাস পাঁচেক আগে হাড়িধোয়া নদীতে ফেলে দিছিলাম। মানিব্যাগ এর কষ্ট সহ্য হচ্ছিলো না।
তবে এবার সাহস করে তৃতীয় দিন বের হলাম। আরশীনগর থেকে গেইটবাজার নেমে পাঁচ টাকার ভাড়া পাঁচ টাকা দিতেই ড্রাইভার ফেরত দিলো। বললো, “ভাড়া দশ ট্যাকা।”
এটাই আমার শেষ সম্বল, দেয়ালে পিঠ ঠেকা।
তাই বুকে সাহস নিয়ে বললাম, “দশ টাকা ক্যান? ভাড়া তো পাচ ট্যাকা ই।”
ড্রাইভার লাল লাল চোখ করে বলে, “ঈদের বোনাস পাঁচ টাকা।”
আমি বলি, “যতদূর জানি বোনাস হয় মূল বেতনের অর্ধেক। আপনি চাইলে সারে সাত টাকা চাইতে পারেন দশ টাকা ক্যান? আর হ্যা, আমিই বা আপনাকে বোনাস দেবো না। আপনি কি আমার কর্মচারী?”
এটা বলেই হনহন করে হেটে চলে আসলাম। গাড়িতে একটা সুন্দরি মেয়ে আছে। তাই ইজ্জত আর কমাচ্ছি না।
এই মেয়েদের একটা ট্রেন্ড তৈরি হইছে ‘আঙ্কেল ডাকা’। যে কাউকেই আঙ্কেল ডাকে। বয়সে বড় না ছোট সেই ভেদ জ্ঞান নাই। আহা! কি সাম্যবাদী। সাধু সাধু!
ভাতিজার স্পিড খেতে চাওয়াতেই এত কথা মনে পড়ে গেলো।
বাদুয়ার চর কাজী আবুল হাসেম উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়তাম। বাসা থেকে এক কিংবা দেড় কিলো দূরে হবে, হেটেই যেতাম। সাথে নিতাম ২ টাকা। অনেক ভাগ্য ভালো হলে মিলত পাঁচ টাকা। বাসা থেকে টিফিন নেওয়ার কোন চল ছিলো না । এটা রীতিমত বিলাসিতা ছিলো। তাই, টিফিনের সময় আজানের দোকান থেকে একটা বা দুইটা সিঙারা খেয়েই কাটাতাম।
তখনকার দুই টাকা আজ স্ফিত হতে হতেই কি ২০ টাকায় পরিণত হয়েছে?
-------রিপন চন্দ্র বর্মন

কোন মন্তব্য নেই